শিরোনাম

রক্তের প্রয়োজনে দিন-রাত ছুটে চলা মানবতার সৈনিক উজ্জ্বল হোসেন

প্রকাশিত: ৫:৫৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২, ২০২৬

রক্তের প্রয়োজনে দিন-রাত ছুটে চলা মানবতার সৈনিক উজ্জ্বল হোসেন

আব্দুস সামাদ আফিন্দী,  বিশেষ প্রতিনিধি ::
মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে সমাজে নীরবে কাজ করে যাওয়া মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তেমনি একজন মানবিক মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবক হলেন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ছোট ঘাগটিয়া গ্রামের সন্তান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য মোঃ উজ্জ্বল হোসেন। রক্তের প্রয়োজনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আজ মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন।
প্রায় এক দশক ধরে তিনি স্বেচ্ছায় রক্তদান করে আসছেন। ইতোমধ্যে ২৭ বার রক্তদান করে বহু মানুষের জীবন বাঁচানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। তবে তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড শুধু নিজের রক্তদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২০ সাল থেকে তিনি একটি বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীদের জন্য রক্ত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত “ব্লাড ব্যাংক জামালগঞ্জ” বর্তমানে উপজেলার অন্যতম মানবিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত। সংগঠনটির মাধ্যমে জরুরি মুহূর্তে রোগীর জন্য রক্তদাতা খুঁজে বের করা, রক্ত সংগ্রহ, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, চিকিৎসা সহায়তা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ১ হাজার ৮২৯ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছেন, যা অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রোগীর স্বজনদের ভাষ্যমতে, গভীর রাত হোক কিংবা ভোরবেলা—একটি ফোনকল পেলেই উজ্জ্বল হোসেন রক্তদাতা খুঁজে বের করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং পরিচিত রক্তদাতাদের সমন্বয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি অসংখ্য পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে এনেছেন।
মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান শুধু রক্তসেবায় সীমাবদ্ধ নয়। “ব্লাড ব্যাংক জামালগঞ্জ”-এর উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত বিনামূল্যের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ হাজার ৭৮২ জন মানুষের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়েছে। এছাড়া অসহায় রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছেন।
বিশেষ করে ২০২২ সালের ভয়াবহ সিলেট বন্যার সময় তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় মানুষের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ, বিতরণ এবং উদ্ধার কার্যক্রমে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সম্প্রতি সাপ্তাহিক জামালগঞ্জ সংবাদ” পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে তাঁর এই মানবিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রক্তের প্রয়োজনে দিন-রাত কাজ করে তিনি অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রেখে চলেছেন। পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করছেন।
মানবতার এই নিবেদিতপ্রাণ কর্মী
উজ্জ্বল হোসেন বলেন, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারাটাই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। একজন রোগী সময়মতো রক্ত পেয়ে সুস্থ হলে সেটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি চাই, আরও বেশি তরুণ রক্তদান ও মানবিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসুক। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে একটি মানবিক ও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
মানবসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ মোঃ উজ্জ্বল হোসেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালকের কাছ থেকে প্রশংসাপত্র ও সম্মাননা স্মারক অর্জন করেছেন। তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সমগ্র জামালগঞ্জবাসীর জন্য গর্বের বিষয়।
নিঃস্বার্থ মানবসেবা, সমাজকল্যাণ এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর অদম্য প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা মোঃ উজ্জ্বল হোসেন আজ জামালগঞ্জের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর মতো মানুষরাই সমাজে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন এবং প্রমাণ করেন—মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ