শিরোনাম

শাল্লায় বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির রামরাজত্ব

প্রকাশিত: ৪:৪২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২৬

শাল্লায় বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির রামরাজত্ব

প্রীতম দাস, সুনামগঞ্জ :  সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় বোরো ফসল রক্ষার প্রাণভোমরা ‘হাওর রক্ষা বাঁধ’ নির্মাণে সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পকেট কমিটি বা পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনের মহোৎসব চলছে। শতকোটি টাকার সরকারি এই কর্মযজ্ঞকে ঘিরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে অকৃষক, ব্যবসায়ী ও বহিরাগতদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে বিতর্কিত এসব কমিটি। ফলে আসন্ন বোরো মৌসুমে কয়েকশ কোটি টাকার ফসলহানির শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা।

​সরকারের ‘কাবিটা’ নীতিমালা অনুযায়ী, হাওর রক্ষা বাঁধের পিআইসি গঠিত হবে বাঁধ সংলগ্ন জমির প্রকৃত সুবিধাভোগী কৃষকদের নিয়ে। কিন্তু শাল্লায় বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, উপজেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির কয়েকজন অসাধু সদস্যের যোগসাজশে নীতিমালার তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমনকি গত ১২ ডিসেম্বর পিআইসি গঠন প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসককে আইনি নোটিশ প্রদান করলেও মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

​তদন্তে দেখা গেছে, বরাম হাওরের ৩৩ নম্বর প্রকল্পের সদস্য সচিব বৃহস্পতি দাস। তার বাড়ি বিলপুর গ্রামে হলেও তিনি প্রকল্প পেয়েছেন মৌরাপুর এলাকায়। স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট হাওরে তার এক ছটাক জমিও নেই। একই চিত্র ১৮ নম্বর প্রকল্পেরও; বাঁধের পাশে জমি থাকা স্বত্বেও কোনো ভূমিপুত্র কৃষককে সেখানে রাখা হয়নি।

​সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে ১১৯ নম্বর প্রকল্প নিয়ে। উপজেলা কাবিটা স্কিম বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্য হিমাদ্রী শেখর দাসের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে নীতিমালা বহির্ভূতভাবে একটি সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ কৃষকরা। এদিকে ২০ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি ও সদস্য সচিবের বিরুদ্ধেও উঠেছে তীব্র ক্ষোভ। মৌরাপুর গ্রামের বাসিন্দা হয়ে তারা পাশের নয়াগাঁও গ্রামের বাঁধের কাজ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি নেতা শিশু সরকার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি না থাকা সত্ত্বেও এই প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছেন।

​মৌরাপুর ও নয়াগাঁও এলাকার কয়েকজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,​”যাদের জমি আছে তাদের কমিটিতে নাম নেই। আর যারা জীবনে কোনোদিন জমিতে কোদাল দেয়নি, তারা এখন বাঁধের মালিক সেজেছে। টাকার বিনিময়ে অকৃষকদের এসব কাজ দেওয়ার মানে হলো—বাঁধ নয়, পকেট ভারী করা। অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে গেলে এই সিন্ডিকেটকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, ডুববে আমাদেরই কপাল।”

​অভিযোগ রয়েছে, শাল্লায় পিআইসি গঠন এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিবর্গ কোনো জমি না থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেট করে একাধিক প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করছেন। কৃষকদের আশঙ্কা, এই অপেশাদার এবং অকৃষক পিআইসিগুলো দায়সারাভাবে কাজ করে বরাদ্দের বড় একটা অংশ পকেটে ভরবে, যার ফলশ্রুতিতে মাটির বাঁধগুলো হবে নড়বড়ে।

​পিআইসি গঠনে এমন সুস্পষ্ট অনিয়ম ও জনরোষ তৈরি হলেও উপজেলা মনিটরিং কমিটি রহস্যজনকভাবে নিরব রয়েছে। কৃষকদের দাবি, জেলা প্রশাসন থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিটি প্রকল্পের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও জমির পর্চা যাচাই করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

​উল্লেখ্য, শাল্লা উপজেলায় প্রতি বছর প্রায় ৪৮৭ কোটি টাকার বোরো ফসল উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ রক্ষার জন্য সরকার প্রতি বছর শতকোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সেই বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিয়ে এখন জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ